আন্তর্জাতিক নদী আইন না মেনে বিপর্যয় ডেকে আনছে ভারত

আন্তর্জাতিক নদী আইন না মেনে বিপর্যয় ডেকে আনছে ভারত

October 17, 2018 1254 By মিরসরাই খবর

 

mAD

সাঈদ হাসান অভি::

কলকল ছলছল ছন্দে বয়ে চলা নদী, দু’পাশে সবুজ মাঠ। ছবির মত সুন্দর গ্রাম। এ রূপ নদীমাতৃক বাংলাদেশের। পৃথিবীর মানচিত্রের আঁকাবাঁকা পলল গঠিত এ বদ্বীপটির জন্ম নদীর থেকে, এমনটাই মনে করেন ভূ-তাত্ত্বিকগণ। নদীর বাঁচা-মরার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের এ সোনার বাংলাদেশের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী ভাগ্য ভাল এমন যে, শুষ্ক মওসুমে খরা আর বর্ষায় ডুবে মরা এখন আমাদের নিয়তি। এ কি শুধুই বাংলাদেশের নিয়তি নাকি এর পিছনে কোন মানবসৃষ্ট কারণ আছে? এ প্রশ্নের উত্তরের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের এ পরিণতির জন্য বারিধির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা। অবিবেচক প্রতিবেশী ভারতের অমানবিক আচরণে অসংখ্য নদী-উপনদী-শাখা নদী, খাল-বিল হারিয়ে গেছে। এদেশের ওপর দিয়ে ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি নদীই হিমালয় ও ভারতের বিভিন্ন উৎসস্থল হতে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছেছে। ৫৪টি নদীর ওপরই ভারত একাধিক বাঁধ দিয়েছে। ফারাক্কার ফাঁদে পড়ে বাংলাদেশের উত্তরাংশ মরুভূমিতে রূপান্তরিত হতে চলেছে, পদ্মার বুকে ধু-ধু বালির চর।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক সময় এদেশে ১২শ নদী ছিল। কিন্তু ভারতের পানি আগ্রাসনের কারণে হারিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার নদী। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানা যায়, নদনদীর সংখ্যা কমতে কমতে ছোট-বড় ২৩০টি নদীর অস্তিত্ব বর্তমান আছে। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ফারাক্কার ব্যারেজ চালু হয় এবং তখন থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল আস্তে আস্তে মরুময়তার দিকে ধাবিত হয়। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পশ্চিম প্রান্তে যেখানে পদ্মা-মহানন্দা মিলিত হয়েছে সেখান থেকে রাজশাহী শহর, চারঘাট হয়ে হার্ডিঞ্জ সেতু পর্যন্ত দৃষ্টি দিলে দেখা যায় বিশাল বিশাল বালুচর। পদ্মা তীরবর্তী মানুষ জানায়, বর্ষা মওসুমে নদীতে পানি ছিল, মাত্র দুই মাস পানি থাকে। তারপর থেকে চর জাগতে শুরু হয়। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৩৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পদ্মার হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে পানির গড় প্রবাহ ছিল ১ লাখ কিউসেকের ওপরে। কিন্তু ১৯৭৪-৭৫ সালের শুকনো মওসুমে এ প্রবাহ নেমে গিয়ে ৭৪ হাজার কিউসেকে দাঁড়ায়। প্রতি বছর এ প্রবাহ শুধু কমছে। গত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়। কিন্তু বড়াল, মরা বড়াল, নারদ, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুরুসাগর, চিকনাই, নাগর, গড়াই, মাথাভাঙা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতাগ, কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজলা, হিসনা, সাগরখালী, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলবাত ইত্যাদি নদী এখন আছে অস্তিত্ব সংকটে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে প্রকাশ, তারা ইতিমধ্যে ১৩টি নদীর অস্তিত্ব বিলীনের ঘোষণা দিয়েছে এবং আরও ৩০টি নদীর সংকটাপন্নতার কথা বলেছেন, যার কয়েকটির নাম ওপরে উলেলখ করা হয়েছে। যেসব নদী সংকটাপন্ন তার মধ্যে অন্যতম হল- রায়মঙ্গল, কালিন্দি, বেতনা- কোদালিয়া, পাগলা, টাঙ্গন, কুলিক, তেঁতুলিয়া, ঘোড়ামারা, তালমা, দেওনাই, চিনাখালী, কোনী, সালদা, বিজনী, হাওড়া, সোনাই, সুতাং, খোয়াই, লংগলা, ধলাই, মনু, জুরি, নোইবড়দাল, নিতাই ও ভোগাই ইত্যাদি।

ভারতের পানি আগ্রসানের ফলে নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। চাষাবাদ, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাঁধের কারণে নদী নাব্যতা হারাচ্ছে ফলে বর্ষা শুরুর আগেই পাহাড়ি ঢলে অতিবৃষ্টির কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশ প্রতি বছরই বন্যা দেখা দেয়। অকাল বন্যায় জানমাল, বাড়িঘর ও ফসল ধ্বংস হচ্ছে। অপরদিকে বর্ষা শেষ হতে না হতেই পানিশূন্য হয়ে পড়ে। খাল-বিল, নদী-নালা ফারাক্কা সমস্যার কারণে কৃষি উৎপাদনে পানির অভাবে জমিতে সেচ দেয়া যায় না। যে কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের খাদ্য ঘাটতি লেগেই আছে। আমাদের দেশে মিঠা পানির একটি বড় উৎস হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি বা একুইফার। পানি বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, নদীগুলোতে উজান থেকে পানি না আসার কারণে পানির স্তর নীচে নেমে যায়। সেচ কাজে মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারও পানির স্তর নীচে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নদীতে পানি না থাকার কারণেই সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে পানির স্তর দ্রুত দিন নিচের দিকে নামিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে দেশে ১১ লাখ শ্যালো টিউবওয়েলের মধ্যে ৩ লাখ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেচ কাজ কঠিন হয়ে পড়ার কারণে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমি সেচ কাজের বাইরে চলে গেছে, যা আমাদের দেশে কৃষি উৎপাদনকে বহুলাংশে ব্যাহত করেছে।

দৈনন্দিন কাজে আমাদের শহরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়। বর্তমানে ঢাকা শহরে ব্যবহৃত পানির ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য শহরে ব্যবহৃত ৫০ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাধ্যমে। ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ২ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। কোন কোন বছর এ মাত্রা প্রায় ৪ মিটার অর্থাৎ দ্বিগুণ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৬.৮ মিটার নিচে, ২০০০ সালে সেই দূরত্ব দাঁড়ায় ৩৪.১৮ মিটারে। ২০০৪ সালে দেখা যায় ৫০.১১ মিটার নিচে এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে ৬০ মিটারেরও বেশি দূর থেকে পানি উত্তোলন করা হয়। বর্তমানে কোথাও কোথাও এ স্তর আরো দ্বিগুণ নীচে নেমে গেছে বলে একটি সূত্র জানায়, সে সব স্থানে ১২০ মিটার নীচ থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। ঢাকা নগরীতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লোকের বসবাস, যাদের দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ২১০ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা ১৭০ কোটি লিটার সরবরাহ করে থাকে এবং এর মধ্যে মাত্র ৩০ কোটি লিটার পানি আসে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে এবং বাকি ১৪০ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হয় রাজধানীর ৪৮২টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এত দূষিত হয়ে গেছে, তা পরিশোধনের পরও পানের অযোগ্য। গড়ে প্রতিদিন ৪০কোটি লিটার পানির ঘাটতি রেখেই রাজধানীর মানুষ দিন কাটিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। সিংহভাগ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন আমাদের নতুন এক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০-২৫ ফুট পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। শুধু ঢাকা কিংবা কুষ্টিয়াই নয়, সারাদেশেই কম- বেশি ভূগর্ভস্থ পানি স্তর নিচে নেমে যাচ্ছ। আর এর ফলে পানিতে আর্সেনিক বিষের পরিমাণ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ কোটি মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং আর্সেনিক দূষণের কারণে প্রতি হাজারে প্রায় ১৩ জনের ক্যান্সার হওয়ার আশংকা রয়েছে। দক্ষিণের ধেয়ে আসা লবণাক্ততার আধিক্য মাত্রা নতুন সমস্যা হিসেবে যোগ হয়েছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খুলনা অঞ্চলে ১৯৭৫-৯২ সময়কালে শুষ্ক মওসুমে লবণাক্ততার পরিমাণ ফারাক্কা বাঁধ পূর্ববর্তী মাত্রার চেয়ে ১৮০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাগরের লোনাপানি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ছাড়িয়ে ২৮০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেছে। বর্তমানে দেশে ১৯ জেলা কম-বেশি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সিডর-আইলার পর উপকূলে লবণাক্ততার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে, যার পরিণতিতে উপকূলীয় এলাকার কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পড়ে গেছে হুমকির মুখে। ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসারে উজানের দেশে ভাটির দেশের সাথে আলোচনা না করে নদীতে বাঁধ নির্মাণ, কোন প্রজেক্ট শুরু করতে পারেনা।

কিন্তু ভারত তাদের এ অন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে যেসব খোড়া যুক্তি দেখাচ্ছে তা হলো: ১. কলিকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা। এ যুক্তির কোন ভিত্তি নেই। কারণ কলিকাতা বন্দরের যাত্রা আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে। বৃটিশরা এই বন্দরের মাধ্যমেই প্রথমে ভারতবর্ষে ব্যবসা শুরু করে। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই কলিকাতা নগর গড়ে উঠেছে। ৪০০ বছর আগের এ বন্দরে কোনদিন নাব্যতা সংকট নিয়ে প্রশ্ন আসল না অথচ ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হবার পর এই সমস্যা দেখা দিল? ধরে নেই, যদি সমস্যা থাকেও তাই বলে কি নাব্যতা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দেয়া ছাড়া কি এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়? ২. সেচ সুবিধাঃ ভারতের আরেক যুক্তি হল সেচ সুবিধা বাড়ানো। কিস্তু সেচ সুবিধার জন্য আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দেয়ার কোন নিয়ম নেই। এক্ষেত্রে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই সেচ সুবিধার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করে থাকে। আর নদী অববাহিকায় সেচ কাজের জন্য নদীর পানির উপর নির্ভর থাকে। ৩. বৃষ্টিবিহীন অর্ধ মরু অঞ্চলে সেচ প্রদানঃ ভারতের প্রধানউদ্দেশ্য নদীর পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের বৃষ্টিহীন এলাকায় সেচ প্রদান। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে হাজার বছর ধরে এ সব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম। প্রাকৃতিক এ কারণে এ সব এলাকায় জন বসতিও কম। প্রকৃতির এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নদীর চলার পথে বাঁধা সৃষ্টি করলে মানবতার সংকট বাড়বে বৈ কমবে না বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ৪. নদী সংযোগ প্রকল্প: এক্ষেত্রে ভারতের ইচ্ছা হল ব্রক্ষ্মপুত্র মেঘনাসহ সকল নদীর পানি ক্যানালের মাধ্যমে গুজরাট মধ্যপ্রদেশ সহ সমগ্রভারতকে এই নদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় এনে এক নতুন ভারত তৈরির স্বপ্ন। এই সংযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে কর্নাটকের গঙ্গা বলে পরিচিত কাবেরী নদীর সাথে সংযোগ স্থাপন করা। বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এসব প্রকল্প আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসারে ভারত বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে গ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশ তার স্বার্থ না দেখে ভারতকে খুশী করতে তাদের অন্যায় আবদার মেনে নিলে এশিয়ার এ অঞ্চলে বিরাট প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিবে, অতএব সাবধান!

লেখক: আইনজীবি

এলএলবি, এলএমএম

চট্টগ্রাম জজ কোর্ট